Basic Info BD https://www.basicinfobd.com/2021/12/blog-post_11.html

হাইপারলুপ টেকনোলজিঃ পরিবহনের নতুন ভবিষ্যৎ বিস্তারিত পড়ুন

 


পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সবচেয়ে দ্রুততম উপায়ে যাওয়ার জন্য হাইপারলুপ হতে পারে একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। হাইপারলুপ সাহায্যে শব্দের গতিতে ভ্রমন করা যাবে। শুনে অবাক হতে পারেন যে চার ঘন্টার যাত্রাকে মাত্র ৩০মিনিটে রূপান্তর করা যাবে। অর্থাৎ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে মাত্র ৮ থেকে ১০ মিনিট। এই কন্টেন্টে আপনারা জানবেন হাইপারলুপ নিয়ে এবং বিশ্বে প্রথম হাইপারলুপ যাত্রা নিয়ে। 

হাইপারলুপ কনসেপ্ট 

২০১২ সালে টেসলা এবং স্পেসএক্স এর এলন মাস্ক হাইপারলুপের কনসেপ্টটি নিয়ে আসে। তিনি একটি স্পিড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের কথা চিন্তা করেন যেখানে একটি ভ্যাকুয়াম স্টিলের টিউবে করে খুব দ্রুত যাতায়ত করা যাবে। প্রাথমিক কনসেপ্ট অনুযায়ী একটি নিম্নচাপের টিউবের মধ্যে লিনিয়ার ইন্ডেকশান মডেল এবং এক্সুয়াল কম্প্রেসর ব্যবহার করে এয়ার বেয়ারিং এর সাহায্যে সিস্টেমটি তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়। এলন মাস্কের ধারনামতে তার এই কনসেপ্টটি স্যান ফ্রাসিস্কো এবং লস আঞ্জেলস এর মধ্যকার ৮ঘন্টার বাস জার্নি  ,৪ ঘন্টার ট্রেন জার্নি অথবা ৩ ঘন্টার বিমান জার্নির এক্সপেরিয়েন্সকে ৩০ মিনিটে আনতে সক্ষম হবে। মাস্ক তার হাইপুরলুপে ব্যবহৃত টিউবের ঘর্ষন কমাতে এবং এয়ার বেয়ারিং তৈরি করতে কম্প্রেসন ফ্যানগুলো প্যাসেঞ্জার পডগুলোর চারপাশে ঘুরতে থাকবে। মাস্কের এই হাইপারলুপের কনসেপ্টটি বাস্তবায়নে আনুমানিক খরচ হিসেব করা হয় ৬ বিলিয়ন ডলার যা পরবর্তীতে আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে মাস্ক বলেন হাইপারলুপের কনসেপ্টটি ওপেন সোর্স হিসেবে থাকবে। এছাড়াও তিনি সবাইকে উৎসাহী করেছেন হাইপারলুপের টেকনোলজি  নিয়ে গবেষণা করে তা আরো উন্নত করার যা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়া জাগায়। 

ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান 


বর্তমানে বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি হাইপারলুপ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। তার মধ্যে হাইপারলুপ ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজি বা হাইপারলুপ টিটি নামে পরিচিত একটি আমেরিকান রিসার্চ কোম্পানি হাইপারলুপ প্রযুক্তিতে একটি অ্যাডভান্সমেন্ট আনতে কাজ করে যাচ্ছে । তারা ইতমধ্যে ফ্রান্সে একটা ফুল স্কেলড টেস্ট ট্র্যাক নির্মান করেছে। তবে হাইপারলুপ প্রযুক্তির সাথে জড়িত বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নামটি হচ্ছে ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান ।জ্বি ঠিকই ধরেছেন। এই সেই ভার্জিন কোম্পানি যে একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। তারা একটি আমেরিকারন ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজি  কোম্পানি যারা হাই স্পীড টেকনোলজি কনসেপ্ট হাইপারলুপ নিয়ে কাজ করে যাছে।  ২০২১ সাল নাগাদ তারা হাইপারলুপ কনসেপ্টকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অক্লান্ত  পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে কোম্পানি মূলত হাইপারলুপ ওয়ান নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় । ২০১৭ সালে ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রান্সন হাইপারলুপ ওয়ানে ইনভেস্ট করেন এবং সে বছরই কোম্পানীর নাম পরিবর্তন করে ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান রাখা হয়। 

হাইপারলুপ টেকনোলজি


এলন মাস্কের কনসেপ্টকে কিছুটা পরিবর্তন করে দুটি নীতি অনুসরন করে হাইপারলুপ টেকনোলজি  ডেভেলপ করা শুরু করা হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে ম্যাগনেটিক লেভিয়েশন টেকনোলজি   যা ইতোমধ্যে মনোরেইল্গুলোতে ব্যবহৃত হয়। ম্যাগনেটিক লেভিয়েশনে সাধারনত দুই ধরনের চুম্বক  ব্যবহার করা হয়।  একটি হলো ট্রাক থেকে ট্রেনকে বিকর্ষিত করে উপরের দিকে ধরে রাখে এবং অন্যটি হলো ট্রাক এর উপর ভাসমান ট্রেনকে নিম্ন ঘর্ষনে পর্যাপ্ত স্পিডে চলতে সহায়তা করে। দ্বিতীয় নীতিটি হলো নিম্নচাপ ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ুশুন্য পরিবেশ তৈরি করে প্যাসেঞ্জার পডগুলোকে মুভ করানোর জন্য । টিউবগুলো থেকে বেশিরভাগ বায়ু সরিয়ে নেওয়ার কারনে এবং মাটির সাথে কোনো সংযোগ না থাকার কারনে পডগুলোকে মুভ করতে খুব একটা বাধার মুখোমুখি হতে হয় না। সাধারনত টিউবগুলোর ভিতরে বায়ুচাপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই লাখ ফিট উপরের বায়ুচাপের সমান হয়ে থাকে যার ফলে পডগুলো খুব অল্প এয়ার্জি খরচ করে সাতশ সাত মেইল প্রতি ঘন্টারও বেশি স্পিডে মুভ করতে সক্ষম হয়। সম্পুর্ন সিস্টেমটি একটি টিউবে থাকা কারনে আবহাওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং সকল অবস্থা অপারেট করতে সক্ষম হয় । ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান সিস্টেমটিকে একটি অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার দ্বারা কন্ট্রোল করা হয়। এ সফটওয়্যারটি সিস্টেমের মধ্যে ত্বরন এবং মন্দন নিশ্চিত করে। ২০১৭ সালের মে তে একটি ফুল স্কেল সিস্টেম টেস্ট চালানো হয় । বর্তমানে তারা হাইপারলুপ প্ল্যানকে আরো উন্নত করে একটি সক্ষম নেটওয়ার্ক বানানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তারা বেশি কিছু বেস্ট রুট খোঁজার গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ নিয়েছে যাতে তাদের হাইপারলুপ টেকনোলজি  যেনো লাভজনক হয়। মোট প্রায় ২৬শ টি লোকেশন এন্ট্রি হয়েছে যেখান থেকে কমিয়ে ৩৫টি লোকেশনে আনা হয়েছে। সবগুলো লোকেশনই সেই দেশের সরকার এবং আরবান প্ল্যানারদের থেকে বেশ সাপোর্ট দেয়া হয়েছে তাদের। তবে তার মধ্যে থেকে হাইপারলুপ প্রোজেক্টের জন্য পাচটি দেশের দশটি রুটকে বাচাই করা হয়েছে । প্রত্যেকটি লোকেশই হাইপারলুপ টেকনোলজি  বাস্তবায়নের জন্য পার্টনারশিপ করে যাচ্ছে ভার্জিন হাইপারলুপ ওয়ান। 

প্রথম হাইপারলুপ তৈরীর দৌড়ে কারা আছে?

দুবাই থেকে আবুধাবি রুটের জন্য প্রথম একটি হাইপারলুপ প্রোটোটাইপ প্রকাশ করে ভার্জিন হাইপারলুপ-১। এর ফলে ২ ঘণ্টার গাড়ির জার্নি কমিয়ে ১২ মিনিটে আনা সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে বিশ্বের প্রথম হাইপারলুপ তৈরীর পথে এগিয়ে আছে ভারত। ২০১৯ সালে ভারত ভার্জিন হাইপারলুপ-১ কে পুনে থেকে মুম্বাই এ একটি হাইপারলুপ নির্মাণের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করে। এই টেকনোলজি তে এই দুই শহরের দূরত্ব সাড়ে তিন ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৩৫ মিনিটে আনা সম্ভব। তবে রাষ্ট্র সরকার পরিবর্তিত হওয়ায় বর্তমানে প্রজেক্টটি স্থগিত আছে। তবে প্রজেক্টটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ভারত সরকারের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সম্প্রতি দিল্লী থেকে মুম্বাইয়ের একটা হাইপারলুপের প্রস্তাবনা দিয়েছেন।  অবশ্য প্রথম হাইপারলুপ তৈরীর সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।  শিকাগো শহরকে পিটসবার্গ ও ক্লিভল্যান্ডের শহরের সাথে যুক্ত করে একটা হাইপারলুপ নিয়ে স্টাডি করা হচ্ছে বেশ বড় পরিসরে। এর ফলে শিকাগো থেকে কিল্ভল্যান্ডে যেতে মাত্র ৩০ মিনিট লাগবে। সম্প্রতি ইউরোপে জেটিসি-২০ নামে একটি জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান উদ্দেশ্য ইউরোপ মহাদেশে হাইপারলুপ নিয়ে কমন এপ্রোচ ডেভেলোপ করা।  

কেন হাইপারলুপ

টেকনোলজিক্যাল উন্নতির সাথে হাইপারলুপ প্রযুক্তি  বেশ কিছু তাক লাগানো ফিচার এবং বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা নিয়ে আসছে আমাদের জন্য। ট্রেন স্টেশনগুলোর মত হাইপারলুপের ও স্টেশন থাকবে । এদেরকে মূলত পোর্টাল স্টেশন বলে। পোর্টালগুলোকে এমনভাবে স্থাপন করা হবে যাতে অভ্যন্তরীন শহর অঞ্চল্গুলোর পরিবহন অবকাঠামোর সাহায্য সহজেই হাইপারলুপকে লিঙ্ক করা যায়। অপরদিকে এই এয়ারপোর্টগুলো শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করবে । এতে করে যাত্রীদের কাছে এয়ারপোর্টের তুলনায় হাইপারলুপের অ্যাক্সেস সহজ হবে এবং বিমান ভ্রমনের চেয়ে হাইপারলুপের যাত্রা সুবিধাজনক হবে। পাশাপাশি হাইপারলুপ সিস্টেমটি টার্ন আপ এবং গো নীতি অনুসরন করে উন্নত করা হবে। হাইপারলুপের প্রধান যে সুবিধাটি আছে সেটি হলো হাইপারলুপের স্পীড । হাইপারলুপের দ্রুতগতিতার কারনে যাত্রার সময় অনেকটা কমে গেছে। এতে করে মানুষ শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খুব কম সময়ে যেতে পারবে।  একটা সময়ে হাইপারলুপকে অবাস্তব মনে হলে বর্তমানে এটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।   

সব ছবি এই লিঙ্ক থেকে নেয়া হয়েছে। 



অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

নটিফিকেশন